Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » সাহিত্য » বিস্তারিত

ইতিহাস চেতনায় সোদপুর পাণিহাটি

২০১৬ আগস্ট ১২ ১২:৪২:৩১
ইতিহাস চেতনায় সোদপুর পাণিহাটি

প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাম বা কৃষ্ণের মত সাধারণের কাছে বুদ্ধও পৌরাণিক চরিত্র বলে গণ্য হতেন। বুদ্ধগয়া মন্দিরে পঞ্চপান্ডবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়।জেমস প্রিন্সেপ (১৭৯৯-১৮৪০) অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধারে বুদ্ধচেতনা জাগে। প্রত্নতত্ত্ব খননবিদ পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়(১৯.৬.১৮৪৯-৪.৮.১৯০৩)ছিলেন সোদপুর হাইস্কুলের ছাত্র। তিনি ১৮৯৭-৯৮ সালে পাটলিপুত্র খনন করে অশোক সম্পর্কে বহু তথ্য উদ্ধার করেন। ১৮৯৯ সালে তার নেপালের কপিলাবস্তু খননে রুমিনদেই বুদ্ধ জন্মস্থান নির্দ্ধারিত হল।ভারতের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ বুদ্ধ ইতিহাসের ধারায় প্রতিষ্ঠিত হলেন।

পাণিহাটিতে পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তার আবক্ষমূর্তি ও একটি ফলক প্রতিষ্ঠা করে তার অবদান প্রতিবছর স্মরণ করা হয়। গত ৪ঠা আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকালে তার গৃহসম্মুখে সভায় সমবেত হন ইতিহাস সচেতন মানুষজন। তার স্মৃতিতে ১১৪তম প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তৃতা করেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুনীল পাল, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা কল্পনা বসু, বিশিষ্ট আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ও প্রাবন্ধিক কৃশানু ভট্টাচার্য প্রমুখ সুধীজন। শ্রোতাদের অধিকাংশ ছিলেন বয়স্ক। অনুষ্ঠানের পুরোধা সুনীল পাল বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে যারা দেশের মঙ্গলসাধন করেছেন, তাদের অনেকের স্মৃতিধন্য এই সোদপুর-পাণিহাটি অঞ্চল। আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চায় নবপ্রজন্মকে প্রাণিত করা প্রয়োজন। আগামী বছর এলাকার প্রতি বিদ্যালয়ে এদের অবদান স্মরণে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে তারা শিক্ষক সমাজকে অনুরোধ জানাবেন।

সুনীল পাল ও তার সহযোগীদের উদ্যোগে আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার দিশারী হয়েছে সোদপুর-পাণিহাটি অঞ্চল। রবীন্দ্রপ্রয়াণের ৭৫বৎসরে ‘পেণেটির বাংলোবাড়ি’ অবশ্য দ্রষ্টব্য। জোড়াসাঁকোর বাইরে তার প্রথম পদার্পণ হয় গঙ্গাতীরে এই ভবনে। এ বাড়ির বৃক্ষলতা, আকাশ, বাতাস, নদীর শোভায় রবীন্দ্রনাথের সদ্য কৈশোর হৃদয়ে আনন্দ ও মুক্তির ‘পরশ আসে’। ছাতুবাবু অর্থাৎ আশুতোষ দেবের এই বাড়িটি ছিল তার ‘ভালবাসার ধন’। জালিয়ানওয়ালাবাগ বর্বরতায় ক্ষুব্দ্ধ কবি প্রাণ জুড়াতে এখানে এসেছেন। মৃত্যুপথযাত্রী সুকুমার রায় তার অনুরোধে সুস্থ্ হতে এ বাড়িতে থেকেছেন। শিক্ষাব্রতী রোকেয়ার পরিকল্পনায়, তার সহকর্মী ব্রাহ্মমহিলাদের অনুরোধে শেরপুরের জমিদার এবাড়িতে ‘গোবিন্দকুমার হোম’ প্রতিষ্ঠা করে অনাথ, দরিদ্র কন্যাদের আশ্রয় দিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। একটি অনাথ মেয়ের বিয়ে উপলক্ষেও এবাড়িতে কবি এসেছেন। শিক্ষাব্রতী রোকেয়া তার স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে ১৯২৮ সালে এই ভবনে এসেছিলেন। ১৯৩২সালে ৯ ডিসেম্বর বিকালে রোকেয়ার সমাধি হয় নিকটে রহমান পরিবারের বাগানে। সেখানে গড়ে উঠেছে পাণিহাটি বালিকা বিদ্যালয় ভবন। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে ও অধ্যাপক শান্তিময় রায় সমাধিস্থান স্কুল প্রাঙ্গনে নির্ধারণ করেন। সৈয়দ মনসুর হবিবুল্লাহ’র অনুপ্রেরণায় সুনীল পাল এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে সেখানে ১৯৯৫ সালে রোকেয়া সমাধি ফলক স্থাপিত হয়। ১৯৯৭ সালে আনুষ্ঠানিক উন্মোচন করেন বাংলাদেশের বদরুদ্দিন উমর। রোকেয়া স্মরণে ভারতে নিয়মিত ‘৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস’ পালন শুরু হল। রোকেয়া সমাধিফলক প্রতিষ্ঠালগ্নে ধ্বংসোন্মুখ ‘পেণেটির বাংলোবাড়ি’‘ঐতিহাসিক’ ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহায়তায় এরা সংস্কার করেন।

রবীন্দ্রনাথ-প্রফুল্লচন্দ্রর স্বপ্নের কর্মসূচী অ্যান্টি-ম্যালেরিয়া কো-অপারেটিভ সোসাইটির সূচনা হয় এই অঞ্চলে। রোকেয়ার লেখাতেও এর সপ্রশংস উল্লেখ আছে। এই সমবায় সমিতির স্রষ্টা বিজ্ঞানী ডাঃ গোপালচন্দ্র চট্টোপাধায় ছিলেন রোনাল্ড রসের সহকর্মী। তার গবেষণালব্ধ জীবনীগ্রন্থ এখানে প্রকাশ করেছেন কৃশানু ভট্টাচার্য। তার আবক্ষমূর্তি নিকটে সুখচরে স্থাপিত হয়েছে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রর কৃতীছাত্র ও সোদপুর বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা নির্মাতা সতীশচন্দ্র দাসগুপ্ত ও ভাই ক্ষিতীশচন্দ্র সোদপুর স্টেশনের ধারে খাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে গান্ধীভাবনায় কৃষি-শিল্প-সমাজ-সংস্কৃতি গড়ায় মগ্ন ছিলেন। গান্ধীস্মৃতি বিজড়িত সেই স্থান এখন গান্ধীভবন।এই অঞ্চলে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্য। তার প্রচলিত দন্ডমহোৎসব, তার স্মৃতিবিজড়িত রাঘবভবন, গঙ্গা তীরের বটবৃক্ষরাজি সগৌরবে বিদ্যমান। সুনীল পালের নেতৃত্বে এখানেই গড়ে উঠেছে রি.ভা.র.-রোকেয়া ইন্সটিটিউট অব ভ্যালু এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ। রোকেয়া দিবসের কাছাকাছি কোন রবিবার শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে, সারাদিনের অধিবেশনে সমাজ উন্নয়নে মহিলাদের অবদান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ পাঠ ও আলোচনা হয়। এবার সপ্তমবার্ষিক সম্মেলনে কানন দেবী, লক্ষ্মী সায়ঘল, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী শতবর্ষ এবং নিবেদিতা সার্ধ শতবর্ষ সম্মন্ধে আলোচনা হবে। প্রথম রি.ভা.র. সম্মেলন উদ্বোধন করে রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য করুণাসিন্ধু দাস বলেছিলেন’রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনায় আঞ্চলিক ইতিহাস চেতনা মানুষকে বিশ্বশান্তি ও প্রগতির পথিক করে। সোদপুর-পাণিহাটি বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, রোকেয়া প্রমুখ মনীষীর স্পন্দন চিত্তে জাগায়।

লেখক: রবীন্দ্র ও রোকেয়া গবেষক।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এআরই/আগস্ট ১২, ২০১৬)