Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

রমজান প্রতিদিন

তাহাজ্জুদ ও রমজান

২০১৮ জুন ০৩ ০২:১০:০৪
তাহাজ্জুদ ও রমজান

এ.কে.এম মহিউদ্দীন, দ্য রিপোর্ট: রোববার ১৭ রমজান । আর তিনদিন বাদেই শেষ হবে মাগফেরাতের দশক। মার্জনার খুশির বার্তা শুধু এ দশদিনেই নয়। পুরো মাস জুড়েই থাকছে এ খবর। মহান প্রভু দয়াময় চান বান্দা তার রঙে রঙিন হোক। আর এ কারণেই সব থেকে বড় মওকা তৈরি করা হয়েছে রমজানুল করিমে। মানবজীবনে ব্যবহারিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য চাষাবাদ করতে হয়, তেমনি নিজের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজন এক অনুপম কর্ষণ। ঠিক এ কারণে প্রতিবছর রমজান ফিরে আসে। রমজানে নানা ইবাদতের চর্চার মধ্যে একটি অন্যতম ইবাদত হলো তাহাজ্জুদ গোজার হওয়ার চেষ্টা করা। তাহাজ্জুদ খোদার কাছে খুব প্রিয় একটি সালাত। সুরায়ে মুজ্জাম্মিলে তাইতো তার প্রিয় হাবিবকে বলছেন, ‘হে কম্বলঅলা ওঠ রাত্রিতে, দাঁড়িয়ে পড়।’
প্রকৃত কথা হচ্ছে তাহাজ্জুদ আল্লাহর নৈকট্যের স্বর্ণদ্বার।

তাহাজ্জুদ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই হৃদয়ের গভীরে জেগে ওঠে পবিত্রতার আমেজ। জেগে ওঠে আত্মসমর্পিত চৈতন্যের, খোদার সান্নিধ্য পিপাসায় উন্মুখ একটা চিত্র। আর রমজানে তাহাজ্জুদ নামাজের সুবর্ণ সুযোগ এসে যায় সাহরি খাওয়ার সুবাদে। ১০/২০ মিনিট আগে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে নিলে ৭০ গুণ সাওয়াব বেশি পাওয়ার সুযোগ তো আছেই সেই সঙ্গে এর প্রভাবে সারা বছর তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাসটিও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেননা এই মাসে মুমিন হৃদয়ের ব্যাকুল আর্তিগুলো সব কদর্য কোলাহল ডিঙিয়ে নিভৃত চিত্তে যখন প্রশান্তির সুবিশাল ছাদের ছায়ায় আশ্রয় পেতে উদ্বেল হয়ে ওঠে, যখন অজস্র মিথ্যা-নশ্বরমুখিতায় বিক্ষুব্ধ হৃদয়টি অলৌকিক আনন্দ ও চিরসজীব সত্যের পরশ পেতে কাতর হয়ে ওঠে, যখন জাহেলিয়াতের পাপে পিষ্ট হৃদয় আলোর সমুদ্রে গোসল করতে জেগে ওঠে বাঁধভাঙা আকুলতায় এবং যখন সব সন্ত্রস্ততা, ক্ষুদ্রতা, মলিনতা, সব বিরুদ্ধ সয়লাব মোকাবিলায় নবতর উদ্যম ও জীবনী শক্তির শরবত পান করতে হৃদয়টা অস্থির হয়ে ওঠে। তখনই একজন মুমিন রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠেন। দাঁড়িয়ে যান মহান খোদার দরবারে।

তাহাজ্জুদ নামাজেই খুঁজে নেন পিপাসার পানি, প্রশান্তির অগাধ ছায়া, অফুরন্ত আরাম। কল্যাণ ও সাফল্যের সহজপ্রাপ্তি তিনি নিশ্চিত করে নেন এর মাধ্যমে। সব অকল্যাণের মোকাবিলায় তিনি একে বেছে নেন ঘনিষ্ঠ সহায়ক ও বলিষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে।
যিনি পুষ্পিত ও বিকশিত জীবনের প্রত্যাশায় জেগে ওঠেন, হার্দ্যিক যোগ্যতায় হয়ে উঠতে চান সবল, খোদার সঙ্গে চান সম্পর্ককে সুগভীর করতে এবং আধ্যাত্মিকতার ঝলমলে মঞ্জিল পানে শুরু করেন পথ চলা, তার অপরিহার্য একটা করণীয় হচ্ছে তাহাজ্জুদ আদায়। যিনি আল্লাহর পথে টিকে থাকতে চান অটল পাহাড়ের মতো, দীনের পথে ছুটে চলতে চান নদীর মতো গতিশীলতায় তার অপরিহার্য একটা করণীয় হচ্ছে তাহাজ্জুদ আদায়। যারাই আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন, আল্লাহর সান্নিধ্যকে মনে করেন জীবনের পরম পাওয়া; তাদের তাহাজ্জুদ আদায়কে আবশ্যক করে নিতে হবে। কোরআন-হাদিস বিভিন্নভাবে একথার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
সালাতে তাহাজ্জুদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তখন, যখন ইসলামের একেবারে প্রাথমিক সময়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও তখন ফরজ হয়নি। ইসলামের নবোদিত সূর্যালোকে বিমুগ্ধ হয়ে যেসব সন্ধানী মানুষ সত্যে মিশে গেলেন, আল্লাহ তাদের নির্দেশ দিলেন ‘রাতে (নামাজে) দাঁড়িয়ে যাও।’ নির্দেশ দিলেন করুণা ও অনুগ্রহের সঙ্গে। স্নেহ ও ভালোবাসার আপ্লুত উচ্চারণে।
কর্মক্লান্ত আল্লাহর রাসুল (সা.)। সাহাবায়ে কেরামও। জীবিকার অন্বেষণে সবার কর্মব্যস্ততা তো ছিলই, তবুও দীনের দাওয়াত নিয়ে সারা মক্কা চষে বেড়িয়েছেন। মানুষকে পথপ্রদর্শনের জন্য ছুটে চলেছেন সকাল-দুপুর। ছুটে চলেছেন বিরুদ্ধতার প্লাবন ঠেলে ঠেলে। উত্তপ্ত বাতাস চিরে চিরে। এরই মধ্যে কারও ওপর দিয়ে হয়তো বয়ে গেছে প্রচন্ড গালাগাল, নির্যাতনের তুফান। আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত সাহাবিদেও দেহ। দুর্বিষহ যাতনায় দগ্ধ সাহাবিদের মানসিকতা। চারদিকে বাধাহীন বর্বতা। চারদিকে টগবগ করছে শত্রুতার দাবদাহ। রাতের অন্ধকারের সঙ্গে নেমে এসেছে গা-ছমছম করা আতঙ্ক। হন্যে হয়ে উঠেছে শত্রুরা। খুঁজছে দু’জন মুসলমান কোথায় জড়ো হয়, কোথায় দাওয়াত দেয় কিংবা কোথায় নামাজে দাঁড়ায়।
হিংস্রতার এতই কোলাহল, কিন্তু কী দুর্বিনীত সাহাবায়ে কেরামের মানসিকতা! সবাই দাঁড়িয়ে গেছেন সালাতে তাহাজ্জুদে। বিনম্র, বিগলিত, দ্রবীভূত হৃদয়। কোরআন তেলাওয়াত করছেন। একটার পর একটা হরফ। মুক্তোর দানার মতো। সুললিত উচ্চারণে। হার্দ্যকি ব্যাকুলতায়। বুঁদ হয়ে আছেন রহস্যের মাদকতায়। অজানা আনন্দে। শিহরণে শিহরণে কখনও ঝিলিক দিয়ে উঠছেন হৃদয়ের কৃতজ্ঞতায়, কখনও প্রত্যাশায় দুলছেন আয়াতের অন্তনির্হিত ইশারা পেয়ে। প্রহরের পর প্রহর কেটে যাচ্ছে। ফুলে গেছে রাসুলে কারিম (সা.)-এর পা। ফুলে গেছে সাহাবায়ে কেরামের পা। কিন্তু সালাতে মগ্ন আছেনই। কখনও সেজদায়, কখনও রুকুতে।

কোন পিপাসায় এত অধীর হয়ে গেছেন সবাই? কোন মুগ্ধতায় এতই অভিভূত তারা? নিশ্চয়ই এই সালাত থেকে তারা সঞ্চয় করতেন নতুনতর প্রাণশক্তি। পবিত্রতার শরাব পান করে হয়ে উঠতেন বলীয়ান। ইশকের আতর মেখে হয়ে উঠতেন চঞ্চল। অবাক সজীবতায়! আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, কমপক্ষে রাতের এক-চতুর্থায়শ সালাতে মগ্ন থাকতে হবে।
তারপর থেকে সাহাবায়ে কেরামের রাত্রিকালীন নিদ্রার প্রাবল্য উধাও। জয়ী হয়ে গেছেন মানসিক সুখ লিপ্সার বিরোধী জিহাদে। যে কোনো কষ্টসাধ্য বিধান এখন তাদের কাছে সহজতর। নৈতিক উৎকর্ষতায় চকচক করছেন একেকজন। হার্দ্যকি যোগ্যতার একেকজন দরিয়া বনে গেছেন । মানসিক গুণাবলীর বিকশিত সৌরভে মৌ মৌ করছে চারপাশ। তারপর থেকে সালাতুত তাহাজ্জুদ আর ফরজ নয়। একমাত্র রাসুল (সা.) ছাড়া সবার জন্য সুন্নত। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম তো পালন করেছিলেন আগের মতো সমান গুরুত্বে। সমান আলোকতায়। সমান মগ্নতায়।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/জুন ০৩,২০১৮)