Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » সাহিত্য » বিস্তারিত

গল্প

হেমলকের গ্লাস

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ০৪ ০২:১৩:৩০
হেমলকের গ্লাস

রোকেয়া আশা

মেয়েটি বাঙালী ; শ্যামলা , বাঁকা কালো চুল । অদ্ভুত হচ্ছে, তার চোখ সবুজ। সাধারণত সবুজ চোখের মানুষগুলো খুব ফর্সা হয় , কিন্তু এই মেয়েটা শ্যামলা।

মেয়েটির সাথে আমার পরিচয় নীলক্ষেতে , আমি তখন পুরনো বইয়ের দোকানে বুদ হয়ে বই দেখছিলাম। আমার পাশেই জলজ্যান্ত আরেকটা মানুষ দাঁড়িয়ে আমার মতই অখণ্ড মনোযোগ নিয়ে - সেটা খেয়াল করিনি। আমরা দুজনই তখন মনসামঙ্গলের একটা ভালো কপি খুঁজছিলাম, এবং সেই দোকানে একটা ভালো কপি পেয়েও গেলাম। সমস্যা হচ্ছে, বইটা মাত্র এক কপিই ছিলো ওখানে। আমরা তাই পরস্পরের দিকে তাকাই। সে মৃদু হাসে আমার দিকে তাকিয়ে, আমিও হাসিটা ফেরত দিই।

সে মৃদুস্বরে বলে,

" বইটা আমরা দুজনই নিতে পারি কিন্তু।"

আমি হেসে মাথা নাড়ি।

দাম চুকিয়ে দিয়ে দুজনই বের হয়ে আসি দোকান থেকে। আমি সেদিন খুব শখ করে শাড়ি পরে গিয়েছিলাম , ও পরে এসেছিলো একটা মনিপুরী কাজের সালওয়ার কামিজ। দুজনের পোশাকের রং কাকতালীয়ভাবে মিলে গিয়েছিলো সেদিন। হলুদ। একদম শীতের রোদের মত।

হাঁটতে হাঁটতে সে বললো,

" হলুদ কিসের রঙ জানো?"

আমি হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে বলি, " বন্ধুত্বের।"

সেও হাসে। হাসির সাথে ওর চমৎকার সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করে।

আমাদের দুজনের বাড়ি শহরের দুই প্রান্তে। তবে সপ্তাহান্তে দেখা হয় দুজনের , কখনো একাধিক বারও। নীলক্ষেতে দুই বান্ধবী পুরনো বইয়ে নাক ডুবিয়ে ভাসতে থাকি , কখনো আরেকটু এগোই । দীপণপুরে যাই কখনো কখনো। বইয়ের ভীরে গা ডুবিয়ে দেওয়া। আমাদের , দুই সদ্য তরুণীর এ আজব বন্ধুত্ব। কফিশপের চে দুজনের বেশী যাওয়া হয় বুকশপে। সে শাড়ি পরতে পারে না। আমার খুব শাড়ির শখ। শুক্রবার গুলোতে এক রঙা কোন সুতির শাড়ি পরে যাই , দুজনের দেখা হয় ; ঘুরে বেড়াই শহরের লাইব্রেরী আর বইয়ের দোকান গুলোয়। কখনো অবশ্য বিরতি দিই, টি এস সিতে গিয়ে বসি। সে চমৎকার গান গায় ; চিরকুট, শিরোনামহীন । অর্ণব আর সায়ানের গানগুলোও গেয়ে শোনায় মাঝে মাঝেই। আমি ওর গান শুনে জয় গোস্বামী কিংবা শুভ দাশগুপ্তের কবিতা বের করি। আবৃত্তি করে শোনাই। আমরা বন্ধু থেকে সখী হয়ে উঠি ধীরে ধীরে।

তারপর ?

তারপর হঠাৎ একদিন খবর পাই , ও মরে গেছে। আমার সখী মরে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ওর সাথে আমার পরিচয় ; এখন দুজনেই তৃতীয় বর্ষে ছিলাম। এখনো আছি, আমি শুধু। ও তো দুম করেই পাস্ট টেন্স হয়ে গেলো।

ওর মৃত্যুর খবর পেয়ে কাঁদিনি, ওর প্রিয় এম্বার রঙের একটা শাড়ি পরে ওর বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম। আগের দুবছরে অনেকবারই ওর বাড়িতে গিয়েছি, সে যাওয়া আর এই যাওয়া এত আলাদা কেন যে হয়ে গেলো!

আমি বাড়িতে পা রাখতেই ওর মা ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো । আমি উনার দিকে তাকাই । আগে যতবার দেখেছি , ততবারই মনে হয়েছে , বাহ্! কি চমৎকার গোছানো আর স্মার্ট ইনি। অথচ সেদিন এত বিধ্বস্ত লাগছিলো উনাকে।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি আমায় জিজ্ঞেস করলেন , " ও এভাবে কেন চলে গেলো বল তো? ওর কিসের এত কষ্ট ছিলো?"

আমি অবাক হয়ে উনার মুখ দেখি। উনি কাঁদতে কাঁদতে জানান , ভোরে নাকি লিভিংরুমে ওর মৃতদেহ টা পড়ে থাকতে দেখেছেন তারা। ওর পাশে তিনটে ট্যাবলেটের পাতা আর একটা পানির আধখালি বোতল পরে ছিলো। তিনটে পাতায় তিন আটে চব্বিশ টা ট্যাবলেট ; ডর্মিকাম। পাতাগুলোতে অবশ্য কোন ট্যাবলেট আর বাকি ছিলো না।

আমি অবাক হওয়ার ধাক্কা কাটেই না। উনার বোন, আমার সখীর খালামণি ছিলেন কাছেই। তিনি এসেই উনাকে ধমকাতে লাগলেন। আমি দেখলাম, জোর করে উনাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলো। উনাকে রেখে খালামণি আবার এলেন , আমার কাছে। খুব ধীরে ধীরে বললেন , " ও যে আত্মহত্যা করেছে , এটা যেন কেউ না জানে। "

আমি কিছু বলি না। তিনি বোঝাতে থাকেন আমাকে , এত সুন্দর আর শান্ত একটা মেয়ে আত্মহত্যা করে বসলো। ওর কিসের অভাব ছিলো? বাইরের লোক শুনলে আজেবাজে কথা বলবে। কেন ও মরে গেলো, এই নিয়ে নানান কথা উঠবে। বেশিরভাগই হবে কুৎসিত, নোংরা।

আমি শুনতে থাকি চুপ করে। আমার আর কিছু বলা হয়না। অথচ আমার তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো, কেন মিথ্যে বলেন আপনারা? যে মানুষগুলো না জেনে অপবাদ দিয়ে দেন , আপনারা কেন করেন? মৃত মানুষকে আবার কেন মেরে ফেলেন ?

আমি কাঁদিনি সেদিন। একটুও না। সবাই জানলো , ও হুট করে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে মরে গেছে। ওর বয়সেও তো আজকাল স্ট্রোক করে মানুষ।

আমি বাসায়ই থাকি , ক্লাস বাদে পুরোটা সময়। আগের মত আর হলুদ শাড়ি পরে শহরটা জুড়ে উড়ি না। রাত হলে ছাদে উঠে বসে থাকি,তারা দেখি। ও কি সুন্দর করে গাইতো,

" রাতের তারা একলা হাসি।

তুমি তাদের নাম দিলেনা ,

মনের ভুলে কেউ দিলো না....

তোমার দেওয়া আমার কোন,

নাম ছিলো না নাম ছিলো না !"

আমার নিজেরও কেমন একটা অবসাদ চলে আসে সবকিছুর প্রতি। ও কেন মরলো, তার কোন উত্তর খুঁজে পাইনি। ওকে সবসময় হাসতেই দেখেছি। কে জানে! আমরা হয়তো সবাই ভেতরে একটা করে হেমলকের গ্লাস নিয়ে পৃথিবীতে আসি।

মানুষ কেন নিজেকে মেরে ফেলে, তার উত্তর খুঁজে না পেলেও মনে হয়, নিজের ভেতরের হেমলক পান করেই আসলে মানুষ মরে। বাইরের বিষ, দড়ি - কলসি বা ব্লেড তো নিছক লোক দেখানো।

ভাবি, ওর হেমলকের গ্লাস কি এতটাই ভারী হয়ে গিয়েছিলো? যার ভার সইতে না পেরে ও পুরোটুকু গিলে খেয়ে নিলো?

আজকাল নানান ভাবনা ভাবি - নিজে সুখী হইনি , এমন ভাবনা কি অন্যদের সুখ দেখে মনে হয় আমাদের? এতসব ঈর্ষার বীজ কোথায় ছিলো অন্তত শৈশবে? আহারে! এই ঈর্ষাই বুঝি হেমলকের গ্লাসটা কানায় কানায় ভরে।

আমি ওর চলে যাওয়া নিয়ে ভাবি না ।মনসামঙ্গল খুঁজে ফেরে যেই তরুণী, তার ভেতরটা জুড়ে মনসার মত নীল বিষের যন্ত্রণা আসা আর এমন কি! ছাই কি ভাবছি! সে তো আমিও খুঁজতাম।

আমার শুধু ভয় হয় আরো মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার আশঙ্কায়।

আহারে! আমার কানের কাছে রাতের বেলা একটা ঝিঁঝিঁ এসে ফিসফিস করে বলে যায় -

কি কষ্ট ! কি কষ্ট!

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ফেব্রুয়ারি ০৪,২০১৯)