Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » » বিস্তারিত

মাকে কষ্ট দিয়ে যুদ্ধে গিয়েছি : শাহীন সামাদ

২০১৪ ডিসেম্বর ১৬ ০২:৩৪:৫৭
মাকে কষ্ট দিয়ে যুদ্ধে গিয়েছি : শাহীন সামাদ

জনপ্রিয় নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শাহীন সামাদ মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তার এ যুদ্ধ তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রেও দেখা গেছে। সম্প্রতি দ্য রিপোর্টের পক্ষ থেকে তার মুখোমুখি হয়েছে মাসুম আওয়াল। তিনি শুনিয়েছেন নিজের লড়াইয়ের গল্প। দ্য রিপোর্টের পাঠকদের জন্য ওই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

প্রথমেই জানতে চাইব স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে কিভাবে সম্পৃক্ত হলেন?

আমি ঢাকা ছাড়ি ২০ এপ্রিল। এরপরে আগরতলা হয়ে কলকাতায় যাই ২৩ এপ্রিল। ওখানে গিয়ে শুনলাম ১৪৪ নাম্বার লেলিন স্মরণীতে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন গঠিত হয়েছে। সেটা ছিল ওখানকার বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসা। উনি আমাদের জন্য উনার বাসার নিচ তলাটা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ওখানে পৌঁছে পরিচিত কাদের সঙ্গে দেখা হল?

ওখানে সৈয়দ হাসান ইমাম, মুস্তাফা মনোয়ার, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, তারেক আলী, মুসাদ আলী, বিপুল ভট্টাচার্য্য, শারমীন মুরশেদ, নায়লা, বুলবুল মহানুবীশ, লতা চৌধুরী— এই রকম অনেকেরই দেখা পেয়েছিলাম। সবাইকে দেখে নিজেকে আর একা মনে হল না। আমাদের সংগঠনের সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গের সমস্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীরা সম্পৃক্ত হয়েছিলেন।

আপনাদের কাজ কী ছিল?

স্বভাবতই আমাদের কাজ ছিল শরণার্থী ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান গাওয়া। গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্ভুদ্ধ করা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও শক্তিশালী করা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতে মঞ্চ করে আমাদের গান গাওয়ানো হত। আমরা নয় মাসে পুরো পশ্চিম বঙ্গতেই ঘুরে ঘুরে গান গেয়েছি। দিল্লিতেও একমাস ছিলাম। সেখানেও আমাদের কাজ ছিল গান গাওয়া।

আপনাদের গান গাওয়ার জন্য কি কোনো সম্মানী দেওয়া হত?

আমরা গান গেয়ে যে সম্মানী পেতাম— সেই টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য হাড়ি-পাতিল, খাবার, পানি, কম্বলসহ নানা দরকারী জিনিস কেনা হত।

আপনাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট কে লিখতেন?

আমাদের একটি স্ক্রিপ্ট ছিল। যেটার নাম ছিল ‘রূপান্তরের গান’। এর স্কেচ করতেন মুস্তাফা মনোয়ার মন্টু মামা ও স্ক্রিপ্ট পড়তেন সৈয়দ হাসান ইমাম। আমরা একের পর এক অনুষ্ঠান করেছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল আমাদের সংগঠনটি ছিল শক্তিশালী। বুঝতেই পারছ এই পাড়ের সকল ইন্টেলেকচুয়াল সঙ্গীত শিল্পীরা এটার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি কলকাতারও অনেক গুণী শিল্পী যুক্ত ছিলেন।

কলকাতার কে কে ছিলেন?

কয়েকদিন আগে আমি সার্টিফিকেটটা বের করে দেখেছি। ওখানে সত্যজিৎ রায়েরও নাম আছে। সবাই ছিলেন ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়ার সুযোগ মিলল কিভাবে?

সব জায়গাতে গান গাইছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে গান গাওয়ার ডাক আসছে। মোটামুটি নাম ডাক হয়ে গেল যখন, তখনই সমর দা (সমর দাস) ডাকলেন। বালিগঞ্জে আমরা গেলাম। একসঙ্গে আমরা আটটি গান রেকর্ড করে দিয়ে এসেছিলাম। এর পরেরবার যখন গিয়েছিলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পাশে আমাদের জাতীয় পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছিলাম। এরপরে আবার আমাদের ডাকলেন, কিন্ত আমরা যেতে পারিনি। তখন আমরা প্রায় ১৪টা গান করি। টালিগঞ্জ স্টুডিও থেকে রেকর্ড করে দিই। সেই গানগুলো প্রায় ছয়মাস বেজেছে।

স্মরণীয় কিছু গানের কথা বলুন

‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘চলো যাই চলো যাই’, ‘দেশে দেশে’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘শিকল পরার ছল’, ‘জাগো জাগো প্রতিবাদী হও’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’, ‘এসো মুক্তি রণের সাথী’, ‘পাক পশুদের মারতে হবে’, ‘শোনেন শোনেন ভাই সবে’সহ আরও কিছু গান।

শিল্পী সংস্থায় আপনারা কতজন ছিলেন?

আমরা প্রথমে ছিলাম ১৭ জন। পরে বাড়তে বাড়তে হয়ে গেল ১১৭ জন। সবাই যে সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন তা নয়। অনেককে শিল্পী বানানো হয়েছে। আমরা তাদেরকে গান শিখিয়েছি। তাদেরকে গান গাওয়ানোর জন্য তৈরি করেছি।

যুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত ছিল?

সে সময় একদম ছোট মানুষ ছিলাম না। আমার বয়স ছিল ১৮। আর সাহসিকতার দিক থেকেও আমি ছিলাম বেশ এগিয়েই।

যুদ্ধে যাওয়ার সময় বাসা থেকে কিভাবে অনুমতি পেলেন?

বাসা থেকে তো অনুমতি দেবেই না— তাই না! আমার একজন শিক্ষক ছিলেন উনিই আমাকে যুদ্ধে যেতে সহযোগিতা করেন। আমি ছায়ানটের ঊনসত্তরের গনঅভ্যুত্থানের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৬৬ সালে ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত হই। আমার বাবা ছায়ানটে ভর্তি করে দিয়ে সেই সালেই মারা গেছেন। আমার মা আমাকে সব সময় চোখে চোখে রাখতেন। তিনি ভাবতেন এই মেয়ে কিছু একটা করে ফেলেবে। তাই করে ফেললাম। মাকে কষ্ট দিয়েই আমি কলকাতা চলে গিয়ে ছিলাম। নিজে মা হওয়ার পরে বুঝেছি মায়ের কষ্ট কেমন? মা তো জানতেন না শেষ পর্যন্ত আমি ফিরে আসব কিনা। অনেকেই পুরো পরিবারসহ গেছে আর আমি মাকে বিপদে ফেলে একাই গিয়েছি। তবে আমি সব সময় আশা করতাম আবারও ফিরে আসব। ফিরে আসব স্বাধীন বাংলাদেশে।

মুক্তির গানে তো আপনি ছিলেন

মুক্তির গানে আমরা সংগঠন থেকেই যায় কয়েকজন। শারমীন সুলতানা, স্বপন চৌধুরী, দেবু চৌধুরী, লতা চৌধুরী, নায়লা— ওরা সবাই ছিল। মুক্তির গানে দেখা যায় যশোরের একটা নদী। ওইখানে কিন্তু সবাইকে যেতে দেওয়া হত না। ওই যে দেখায় না বাদশা ভাইয়ের পারমিশন নিতে হয়। সত্যি সত্যিই বাদশা ভাইয়ের পারমিশন নিতে হয়েছিল। সেইখানে আমাদের সংগঠনের সভানেত্রী ছিলেন সানজিদা আপা, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহমুদুর রহমান। উনি দীর্ঘদিন লন্ডনে ছিলেন। এখন বাংলাদেশে এসেছেন। সব মিলিয়ে মুক্তির গানের শুটিংটা ছিল অনেক কষ্টের্। একটা ভাঙা ট্রাকে করে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে যাওয়া খুব কঠিন ছিল।

মুক্তাঞ্চলে যাওয়া তো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল

আসলেই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ওইখানে সব জায়গাতে মাইন পোতা ছিল। সংগঠনের পক্ষ থেকেই আমাদের এদিক সেদিক যেতে নিষেধ করা হয়েছিল।

সে সব দিনের কথা নিশ্চয় খুব বেশি মনে পড়ে!

এটা আমার বিরাট পাওয়া। দেশের জন্য একটু কিছু করতে পেরেছি। দেশকে স্বাধীন করার জন্য, আমাদের নিজস্ব পরিচয় আমাদের পতাকার জন্য কিছু করতে পেরেছি। আমাদের চিন্তায় ছিল একটা স্বাধীন দেশ হবে। আমরা মনের মতো করে আমাদের দেশ গড়ব। আমাদের দেশকে ভালোবাসব। এতো রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা— এ রক্ত কখনোই বৃথা যেতে পারেনা।

নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে কিছু বলুন

স্বাধীনতার ৪২ বছরে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। আমি মনে করি আমাদের তরুণ প্রজন্ম আরও অনেক দূর এগিয়ে নেবে আমাদের দেশকে। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার অনুরোধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পঠন-পাঠনের মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ কর। হানাহানি মারামারি না করে ভাল মতো পড়ালেখা কর। নিজেদের শেকড়কে শক্তিশালী করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। দেশের মুখ উজ্জ্বল কর।

(দ্য রিপোর্ট/এএ/ডব্লিউএস/ডিসেম্বর ১৬, ২০১৪)