প্রচ্ছদ » রাজনীতি » বিস্তারিত

ফকির মুহম্মদ শওকত আলী

অতিথি লেখক

‘আমি মমতার সৈনিক’

২০১৭ নভেম্বর ১৯ ১৬:২১:৪৪
‘আমি মমতার সৈনিক’

ভারতের পশ্চিমবাংলা থেকে এমএলএ রফিকুর রহমান বাংলাদেশের যশোরে বেড়াতে আসছেন শুনে বন্ধুবর আব্দুর রবকে বলেছিলাম তার সাক্ষাত পাইয়ে দিতে। সত্যি সত্যি গেল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসেছিলেন ভদ্রলোক। দুর্গাপূজা-মহররম সামনে রেখে। ছোট ছেলে অভিকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য তাকে বিদেশী কোটায় খুলনার একটি মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ানো যায় কীনা-তা সরেজমিনে দেখা বা বোঝা। উঠেছিলেন চাচাতো ভাই ও বাল্যবন্ধু মফিজুর রহমানের ঊপশহরের বাড়িতে। ওপারে গেলে মফিজও সময় সময় ওঠেন রফিকুর রহমানের বাড়িতে। কিছুদিন আগে মফিজুর রহমান, আব্দুর রব ও আনিসুর রহমান বেড়িয়ে এসেছেন। উপলক্ষ্ ছিল রফিকুর রহমানের বড় ছেলের বিয়ে। ফিরে এসে বরযাত্রী,বিয়ের অনুষ্ঠান, বউভাত, মেহমানদারী নিয়ে বিস্তর গল্প শুনিয়েছিল রব। তবে রবের সব গল্প ছাড়িয়ে বড় হয়ে উঠেছিল রফিকুর রহমানের দৈনন্দিন রাজনৈতিক জীবনাচারের বর্ণনাগুলো।

নানান কারণে আমি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এপার বাংলার একজন বরকন্দাজ হয়ে উঠেছি। অলসতার সাথে জেহাদ করে তাকে নিয়ে স্বনামে অন্তত দুটি লেখাও লিখেছি। মমতা আপার দলের এমএলএ রফিকুর রহমান, তাও আবার আমার একান্ত আপনজন রব, মফিজদের কাছের মানুষ। মনে করেছিলাম অনেক সময় ধরে গল্প করা যাবে। কিন্তু এসেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। তার ব্যস্ততা দেখে সময় বের করতে পারছিলেন না রব। অগত্যা রবের পরামর্শ মত মফিজুর রহমানকে কল দিলাম। আমার অভিপ্রায় জেনে মফিজুর রহমান ফোনটি ধরিয়ে দিলেন স্বয়ং রফিকুর রহমানের হাতেই। কুশলাদি বিনিময়ের পর চায়ের দাওয়াত দিলাম। সানন্দে কবুল করলেন। পরদিন সন্ধ্যায় যশোর প্রেস ক্লাবে।সময় মতই আনিসুর রহমানের গাড়িতে করে পৌঁছুলেন পশ্চিম বাংলার এমএলএ রফিকুর রহমান। গায়ের পাঞ্জাবি দেখে চিনে নিতে কষ্ট হলো না বাংলা রাজ্য বিধানসভার উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার আমডাঙ্গা আসনের তৃণমূল দলীয় বিধায়ককে। রবের বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে গেল। সাথে রব, আনিস, অভি। রফিকুর রহমান আসছেন বলে মুক্তিযোদ্ধা জেএসডি নেতা আব্দুস সালাম, বন্ধুবর নজরুল-ভাবুক সাংবাদিক এইচ এম সিরাজ, গাজী ফরিদকে পূর্বেই জানিয়েছিলাম। একজন বিদেশী মেহমান আসছেন, তাই ছোটছেলে বরকতকে সাথে আনার লোভ সামলাতে পারি নি। বসলাম প্রেসক্লাবের ভিআইপি মেহমানখানায়। বরকতকে পরিচয় করিয়ে দিতেই আপন করে নিলেন, একবারেই ‘তুই’তে ।

পরিচয় পর্বের পর জানতে চাইলাম তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি আর মমতার সরকারের বিশেষত্ব নিয়ে। পূর্ববর্তী বাম জমানা এবং তারও আগের কংগ্রেস আমলের সাথে তাদের আমলের গুনগত পার্থক্য জানতে চাইলাম। বললেন মমতার কন্যাশ্রী, নিম্নশ্রেণীর সকল শিক্ষার্থীর জন্য চপ্পল,উপর ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের সাইকেল দান, বিনামূল্যে কিডনির ডাইয়ালোসিস ও হার্টের চিকিৎসাসহ নানা কর্মসূচির কথা। সৈয়দ,খান উপাধীধারী উচ্চবংশীয় মুসলমান বাদে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের প্রাদেশিক সরকারের চাকরি দিতে কী কৌশল নিয়েছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়- তাও বললেন আমডাঙ্গা থেকে দ্বিতীয় বার নির্বাচিত এই তৃণমূল বিধায়ক।

কথা বললেন নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুড় নিয়ে। কীভাবে জনগণের এই আন্দোলন সিপিএমকে জনগণের বিপক্ষে নিয়ে গেল আর মমতাকে নিয়ে এলো সামনে। বাদ গেল না কেন্দ্রীয় সরকারের দুই টাকা কেজি চালের কর্মসূচিকে মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলায় কীভাবে সর্বজনীন কারেছেন এবং কত মানুষ তার সুবিধাভোগী হয়েছেন। কথা হলো বশিরহাটের সাম্প্রদায়িক অসহিঞ্চুতা কীভাবে মমতা বন্দোপাধ্যায় সামাল দিলেন সে প্রসঙ্গে। বললেন, সামনে একই সময়ে দুর্গাপূজা ও মহররম, বিজেপীর মত সাম্প্রদায়িক শক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। নেত্রীর কড়া নির্দেশ, সকলকে নিজের এলাকায় থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাই ফিরে যেতে হচ্ছে তাড়াতাড়ি। সেখানে সব সম্প্রদায়ের নেতাদের নিয়ে বসতে হবে। দলকেও সতর্ক রাখতে হবে।

কথা উঠালাম দার্জিলিংপাহাড়ের আন্দোলন নিয়ে। রফিকুর রহমান বললেন, দুই এক দিনের মধ্যেই দেখবেন আন্দোলন থেমে গিয়েছে। মমতা বন্দোপাধ্যায় পাহাড়ে আগের চেয়ে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তৃণমূল সেখানে ভোটেও ভাল করছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রতিবেশী দেশ চীন পাহাড়কে নিয়ে রাজনীতি করছে। প্রশ্ন করলাম কীভাবে? জবাব দিলেন তৃণমূল বিধায়ক। জানালেন পাহাড়কে বাংলা থেকে আলাদা করতে সহিংসতা উষ্কে দিচ্ছে বিজেপি, আর চীন করছে মঙ্গলয়েড জাতি সত্তার রাজনীতি।

রাতে যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকার এক বাড়িতে দাওয়াত ছিল রফিকুর রহমানদের, তাই এবার ওঠার পালা। বিদায় পর্বে সবিনয়ে বললেন, আপনারা সাংবাদিক, এই আলাপচারিতা নিয়ে না লিখলেই ভাল হয়। কারণ আমি কোন নেতা নই। তার পরও যদি লেখেনই তবে আমার পরিচয় দেবেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের একজন সৈনিক হিসেবে, তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি আসলে মাটি-মানুষ নিয়ে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নিজস্ব ভাবনা।

তার বক্তব্য সারাংশ করে আমার মনে হয়েছে,বিধায়ক রফিকুর রহমানের মতে তৃণমূলের রাজনীতির বর্তমানও মমতা, ভবিষ্যৎও মমতা। তৃণমূলের রাজনীতিতে তিনি কারো উত্তরাধিকার নন, তারও কোন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নেই। উপমহাদেশের উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে মমতা স্বসৃষ্ট, বাংলার মানুষই তার উত্তরাধিকার।

লেখক: সাংবাদিক