Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » সাহিত্য » বিস্তারিত

গল্প

ভোরের খুব কাছে

২০১৮ অক্টোবর ২০ ০৯:২৪:৩২
ভোরের খুব কাছে

রোকেয়া আশা

স্কলারশিপটা পাওয়ার পর আমার মুখ যতটা হাসিহাসি হয়েছিলো, তারচেয়ে বেশি বাবা আর মামণির মুখ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো। দুজনেই প্রচণ্ড রকম আপত্তি জানিয়েছিলো, একমাত্র ছেলেকে তারা বিদেশে পাঠাবে না। কিন্তু বরাবরের মতই এবারো আমার জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় তারা। আর আমি জানুয়ারির শেষের দিকে তুরস্কে যাওয়ার প্লেনে চড়ে বসি।

ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে আমি যখন পৌঁছাই তখন ভোর চারটে বাজে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা মিটিয়ে বের হতে হতে সকাল সাড়ে ছয়টা! এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে আমি ছোটখাটো একটা ধাক্কার মত খাই। বাইরে সবকিছু ধবধবে সাদা বরফে ঢাকা, ঝিরঝির করে তুষার পরছে। আর সকালের প্রথম রোদ এসে পরেছে এই অদ্ভুত সুন্দর তুষারের গায়ে। মনে হচ্ছিলো আকাশ থেকে তুষার না, লক্ষ লক্ষ ক্রিস্টালের কণা ঝরে পরছে।
আমি বুক টেনে শ্বাস নেই। আহ্! কনস্ট্যান্টিনোপল! সে অটোমান যুগ থেকে আজও সুন্দরী - ইস্তাম্বুল।

ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিতে আমার ক্লাস শুরু হয় মার্চে, আর তখনই বড়সড় একটা ধাক্কা খাই আমি। এখানকার শিক্ষকেরা সব ভীষণ রকম মাতৃভাষা প্রেমী। ইংরেজি পারতপক্ষে বলতেই চায় না। সব ক্লাসই তার্কিশে। মুশকিল হচ্ছে, তার্কিশের ওপর একটা কোর্স করলেও তুর্কীদের মুখের এত দ্রুত বলা তার্কিশ আমি বুঝে উঠতে পারিনা। একটা শব্দ না ধরতেই আরেকটা গোটা বাক্য মাথার উপর দিয়ে চলে যায়।
সেদিনও এরকম হযবরল ক্লাস শেষে বেরিয়েছি, ডর্মে যাবো ভাবছি এমন সময় পেছন থেকে রিনরিনে একটা স্বরে "আহসান " ডাক শুনে থেমে যাই, পেছনে তাকিয়ে দেখি অপ্সরার মত দেখতে এক তরুণী ; জিন্সের ওপর মোটা ওভারকোট পরনে। সাথে টুপি আর মাফলার। ডাক শুনেই বুঝতে পেরেছি এই মেয়ে আমার ক্লাসেই পড়ে। একটু লজ্জাই লাগছিলো তখন, এখনো ক্লাসের তেমন কারো সাথে পরিচিত হইনি। মেয়েটা আমার নাম জানে, আর আমি এদিকে ওকে বলতে গেলে চিনিও না।
সুন্দরী ক্লাসমেটকে না চেনাটা বাংলাদেশে অপরাধের মত, এখানেও কি তাই?
ভাবতে ভাবতেই মেয়েটা এগিয়ে এলো।
ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
- শাফিলিয়া, শাফিলিয়া শাহীদ। তুমি তো নিবিড় আহসান , তাইনা?
আমি মাথা নেড়ে ওর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরে হ্যান্ডশেক করলাম। এবং সাথে সাথে মনে মনে গালমন্দ করা শুরু করলাম তুরস্কের এই শীতকাল টাকে। যদিও এখানে এসেই এই ঋতুর প্রেমে পরেছিলাম আমি। কিন্তু এখন এই কনকনে ঠাণ্ডার জন্য আমাদের দুজনের হাতেই মোটা দস্তানা, সুন্দরীর হাতের উষ্ণতা পেলাম না শুধু এই হতচ্ছাড়া শীতের জন্য।
বুঝলাম, লাভ এট ফার্স্ট সাইট কাকে বলে।

শাফিলিয়া আমাকে তার্কিশ শেখাতো, যদিও ও নিজে তুর্কী নয়। জন্ম ওর আফগানিস্তানে; ওর দুবছর বয়সে ওর পুরো পরিবার তুরস্কে চলে আসে, অভিবাসী হয়ে। ওর বেড়ে ওঠা এই ইস্তাম্বুলেই। যদিও কৈশোরের একটা অংশ ওর কেটেছে আঙখারায়।
শাফিলিয়ার সাথে অল্পদিনেই খুব ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় আমার। শাফিলিয়া আমায় ওর বাড়িতে নিয়ে যায় একদিন।
সেখানেই আমার পরিচয় হয় ওর মা, বাবা আর ভাইয়ের সাথে।
আমি বাংলাদেশী শুনে ওর বাবা জায়িম রাশীদ খুব হাসিখুশি ভাবে কথা বলেন আমার সাথে।
- তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছো? তোমরাই তো পাকিস্তানকে যুদ্ধে হারিয়েছো, না?
- জ্বি। সেটা ১৯৭১ সালের কথা।
- খুব ভালো। ওরা আমার দেশেও খুব অত্যাচার করে। কাবুল নদীকে লাল করে ফেলেছে, এত রক্ত ঝরিয়েছে আমার দেশে।
আলাপ আরো এগোয়। এরপর থেকে ওদের বাড়িতে মাঝে মধ্যেই যেতাম আমি। একদিন কথায় কথায় উনাকে জানালাম, আমার দেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। শুনেই উনি চোখ বড় বড় করে ফেললেন।
- কি বলো! শুক্রবার! রবিবার না?
- না। আসলে শুক্রবার জুমুয়ার নামাজ থাকে, সব মসজিদে একটু সময় নিয়ে খুতবা পড়া হয়। তাই এইদিন আমাদের উইকএণ্ড।
উনি শুনে খুব খুশি হলেন।
আরেকদিন কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলেন,
- তোমাদের দেশে তাজিয়া মিছিল হয় না?
আমি বললাম, 'শিয়ারা করে, আমরা অবশ্য ওসবে যাই না।"
একথা শোনার পর জায়িম রাশীদ সাহেব খুব গম্ভীর হয়ে উঠে গেলেন। আমি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ করে কি হলো। এরপর নানান ব্যস্ততায় ওদের বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি। অবশ্য শাফিলিয়ার সাথে ক্যাম্পাসে আর আশেপাশে ঘোরাঘুরি ঠিকই চলছিলো।
দেখতে দেখতে এপ্রিল চলে এলো, শীতের শেষে বসন্ত। শাফিলিয়া একদিন বললো, "চলো, এমিরগানে যাই।নাহলে বসন্তের আমেজই পাবে না কিন্তু। "
ওর কথামত এমিরগানে গিয়ে চমকে গেলাম। এত এত টিউলিপ ফুল! যদিও আমার মনে তখন বাংলাদেশের জারুল, সোনালু আর কৃষ্ণচূড়ার ছবি ভাসছে।
আমি ডুবে গেলাম, যতটা না টিউলিপের মেলায়, তারচেয়ে অনেক বেশী শাফিলিয়ার সবুজ চোখে। ওর মুখের খুব কাছাকাছি গিয়ে বলে ফেললাম,
- আমি তোমাকে ভালোবাসি শাফিলিয়া।
ও ছলছল চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর কিছু বললো,
- চলো, ফেরা যাক।
আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। মনে হচ্ছিলো, ও কেন আমায় ভালোবাসলো না।
এরপর কিছুদিন আমরা দুজনই কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব দেখিয়ে ক্লাস করলাম। তারপর হঠাৎ একদিন ও ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিলো।
একদিন, দুদিন, এক সপ্তাহ, এভাবে একটা পুরো মাস কেটে গেলো। নীল জলরাশির তীরের ইস্তাম্বুলে তখনো বসন্ত, কিন্তু আমার কাছে সব ধূসর।
হঠাৎ একদিন খবর পেলাম, জায়িম রাশীদ গ্রেফতার হয়েছে, নিজের মেয়েকে খুন করার অপরাধে।
আমার পুরো পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে এলো। শাফিলিয়া নেই?
জেলে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জায়িম রাশীদের সাথে দেখা করার অনুমতি মিললো।
আমি মুখ শক্ত করে জিজ্ঞেস করলাম, " কেন মারলেন ওকে?"
লোকটা তখন নির্লিপ্ত হয়ে উত্তর দিলো,
- একজন শিয়া হিসেবে ওর বিয়ে তো শিয়া ছেলের সাথেই হওয়া উচিৎ। আমি ভালো ছেলের সাথেই ওর বিয়ে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু ও মানলোনা। ও বললো ও তোমাকে ভালোবাসে নিবিড় আহসান।
অনেক বুঝিয়েছি, ও বোঝেনি। আমি সন্তানের জন্য ধর্ম তো বিসর্জন দিতে পারিনা।
আমার সেদিন এসে এমিরগানে শাফিলিয়ার ছলছল চাহনির কথা মনে পড়লো। এবার মনে হলো, ও কেন আমায় ভালোবাসলো? নাহলে তো আমার শাফিলিয়া বেঁচে অন্তত থাকতো।
আমি দেশে ফিরে আসি তার কিছুদিন পর। বাংলাদেশেও যখন আমি পৌঁছাই, তখন ভোর হচ্ছে। শাফিলিয়ার চোখের মত পবিত্র ভোর।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/অক্টোবর ২০,২০১৮)