Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » সংবাদ পর্যালোচনা » বিস্তারিত

প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান

একজন মহৎ শিক্ষক

২০১৮ অক্টোবর ২০ ১৬:৩৪:৩০
একজন মহৎ শিক্ষক

পাভেল চৌধুরী

প্রফেসর মোস্তাফিজুুর রহমান মারা গেলেন, চলতি মাসের ১০ তারিখে। বয়স ৮০ বছরের কাছাকাছি হয়েছিলো। শয্যাশায়ী ছিলেন কিছুদিন। তাঁর এই মৃত্যু যে কারণে অপ্রত্যাশিত ছিলো না, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো অবশ্যই। জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন। মাইকেল মধুসূদন কলেজেই অধিকাংশ সময়, যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব ছিলেন, যশোরে সরকারি সিটি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন, স্কাউট আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। কর্মক্ষেত্রের সর্বত্রই তাঁর সাফল্য ছিলো, তাঁকে নিয়ে বিতর্ক ওঠেনি কখনও; সমালোচনাও না।

শিক্ষক হিসাবে জনপ্রিয় ছিলেন। পঠন-পাঠনের কারণে শুধু না, আসলে ছাত্রদের তিনি নৈকট্য লাভ করেছিলেন। স্নেহ আর সহমর্মিতা ছিলো তাঁর অন্যতম গুণ। ছাত্রদের জন্য তিনি বই লিখেছিলেন, অর্থনীতির পাঠ্য বই, উচ্চ মাধ্যমিক আর স্নাতক শ্রেণির জন্য। মন বুঝতেন ছাত্রদের, বুঝতেন মানও। সেই নিরিখেই তিনি তাঁর বইগুলো সাজাতেন। যে কারণে দীর্ঘদিন বাজারে তাঁর বই ছিলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমানের এই বাজার অর্থনীতির যুগে বাজারে অসংখ্য অর্থনীতির বই থাকলেও প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের বইয়ের পাশে দাঁড়াতে পারেনি কোন বই-ই।

অমায়িক ছিলেন ব্যবহারে, সদাহাস্য, সব শ্রেণীর মানুষের সাথেই মিশতেন আন্তরিক ভাবে। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের বাইরেও তাঁর ছিলো বিরাট সামাজিক পরিমন্ডল, গ্রহণযোগ্যতাও ছিলো সর্বস্তরেই। অবসর জীবনের অবসরে তিনি বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। শহরের ব্যস্ততম এলাকা দড়াটানা’য় ‘যশোর বুক ডিপো’ নামে তাঁর বইয়ের দোকান ছিলো। অনেক সময়ই তাঁকে সেই বইয়ের দোকানে বসে থাকতে দেখা যেতো। পরিচিত মানুষজন দেখলে ডেকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন, খোঁজখবর নিতেন নিকটজনদের।

প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন একটা যুগের প্রতিনিধি। যে যুগে শিক্ষকরা ছিলেন সমাজের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় সম্মানিত মানুষ। গ্রাম কিংবা শহর কোথাও এই অবস্থানের ব্যতিক্রম ছিলো না। যে কোনো ধরণের সামাজিক সমস্যা সংকট বা পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষকরাই ছিলেন অগ্রগণ্য। এই মান্যতার পেছনে কারণ ছিলো শিক্ষকদের নৈতিকতা, লোভ লালসাহীন তাঁদের পরিচ্ছন্ন জীবনাচরণ। সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকরা ছিলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এই মানুষ গড়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ঠ ছিলো না, খুব গুরুত্বপূর্ণও ছিলো না, সবচেয়ে বেশী যেটার প্রয়োজন ছিলো সেটা হোলো মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি,নৈতিকতা। শিক্ষকতা পেশার সাথে আর্থিক অবস্থার সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকদের নৈতিকতা। শিক্ষকরা ছিলেন সেই নৈতিকতার মূর্ত প্রতিক। ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্ক ছিলো সম্প্রিতির, সৌহার্দ্যরে। পরিবারের বাইরে শিক্ষকরাই ছিলেন ছাত্রদের ভরসাস্থল, শেষ আশ্রয়। যে কারণে ছাত্রদের প্রতি শিক্ষকের শাসন ছিলো, কখনও কখনও সে শাসন নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পৌঁছাতো হয়তোবা, কিন্তু বিদ্বেষ ছিলো না, ছিলো না প্রতিশোধ স্পৃহাও। সারাজীবনই তাই ছাত্রদের কাছে শিক্ষকরা ছিলেন শ্রদ্ধেয়, সম্মানের প্রতিভু। ছাত্রদের সাফল্য যতো উচ্চ পর্যায়েরই হোক, শিক্ষকদের কাছে তারা ছিলো নতজানু।

এখন পরিস্থিতি পাল্টিয়েছে। শিক্ষক ছাত্র সম্পর্ক এখন আর সৌহার্দ্য বা সম্প্রিতির না, ছাত্ররা হয়ে উঠেছে শিক্ষকের প্রতিপক্ষ। যে কারণে ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়া বা শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র নিগৃহিত হওয়ার ঘটনা এখন নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। শ্রদ্ধা নেই, স্নেহ নেই, যেটা আছে সেটা হলো দেনা পাওনার হিসাব। কে কতোটুকু দিলো, নিলো কতোটুকু - এটাই মূল কথা। সম্পর্কের এই নব পর্যায়ের কারিগর কে ? - টাকা। শিক্ষক এখন ছুটছে টাকার পেছনে, ব্যক্তিগত ভাবে যেমন, প্রতিষ্ঠানগত ভাবেও তেমন। ক্লাসে ব্লাক বোর্ডে লিখে শিক্ষক পড়াচ্ছেন, হঠাৎ চক্ দিয়ে একটা বড়ো দাগ টেনে বললেন, এ পর্যন্তই, এর পরে যদি জানতে চাও, শিখতে চাও, আমার কাছে আসতে হবে। অর্থাৎ তাঁর কোচিং সেন্টারে যেতে হবে অথবা তাঁকে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে রাখতে হবে। টাকা বা মুনাফা যখন কোনো বিষয়ের চালিকা শক্তি হয়; নীতি নৈতিকতা তখন গৌণ হয়ে যায়, গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে সম্পর্কের মান বিচারও। এক অনিদিষ্ট অন্তহীন কুহকের পেছনে মানুষ ছুটতে থাকে, টাকার নেশা মনুষ্যত্বের গুণবাচ্য সবকিছু থেকে তাঁকে নির্মমভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। সব শিক্ষকের ক্ষেত্রেই যে এ কথা বলা যাবে এমন না, তবে আমাদের দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই যে উপর্যুক্ত পরিস্থিতি আধিপত্য বিস্তার করেছে এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই।

অভিভাবকরাও যে এই পরিস্থিতির বাইরে এমন না। যে কোন কারণেই হোক মানুষের হাতে এখন টাকার পরিমাণ বেড়েছে। টাকাই ক্ষমতা, মান সম্মান এমন কী সামজিক-রাজনৈতিক মর্যাদাও টাকা দিয়ে নির্ধারিত হচ্ছে। অতএব শিক্ষা এর বাইরে থাকবে কেন? কিন্তু শিক্ষার কেনা যায় কোনটা ?-রেজাল্ট, অর্থাৎ পরীক্ষার ফল। পরীক্ষায় ভালো ফল করা এখন একটা টেকনিক্যাল ব্যাপার; নানা ধরণের বই, নানা ধরণের কৌশল, কূটকৌশলও বলা যায় এবং এ ব্যাপারে দক্ষ প্রশিক্ষক এখন টাকার বিনিময়ে কেনা যায়। শিক্ষা তার বৃহৎ পরিসর থেকে গুটিয়ে এসে কেন্দ্রিভূত হয়েছে কেবলমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক রেজাল্টে। ভালো ছাত্র অর্থ দাঁড়িয়েছে ভালো রেজাল্টধারী কিন্তু প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এই রেজাল্টের সম্পর্ক কতোটুকু ? খুব বেশী না, বরং বলা যায় সামান্যই, ক্ষেত্র বিশেষে নেইও। অর্থই অনর্থের মূল,-বাংলা ভাষায় কবে থেকে এই প্রবাদের প্রচলন হয়েছিলো বলা যাবে না তবে অর্থের সর্বনাশা ভূমিকা সম্পর্কে মানুষ যে অনেক আগে থেকেই ভেবেছে এই প্রবাদই সেটা দেখিয়ে দেয়।
প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান যখন শিক্ষকতা করেছেন তখন এই পরিস্থিতি ছিলো না, সূচনা হচ্ছিলো হয়তো। শিক্ষকতার যে একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে যা অন্যান্য কোন পেশার সাদৃশ্য না মোটেই, একেবারে ভিন্ন, সেই সংস্কৃতি তিনি আমৃত্যু ধারণ করেছিলেন, রপ্ত করেছিলেন দক্ষতার সাথে। যে কারণে তিনি অবিস্মরণীয়, বেঁচে থাকবেন দীর্ঘদিন।

মোস্তাফিজ স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো পড়াশোনা শেষে শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন কলেজ, খাজুরা’য় যেদিন আমি অর্থনীতি বিষয়ের প্রভাষক পদের জন্য ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম, সেদিন। অতঃপর ঘটনাক্রমে ঘনিষ্ঠতা। উপশহর কলেজ, যশোর,এ উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে তিনি আমাকে ওই পদে আবেদন করার জন্য বলেছিলেন। আমি রাজী হইনি (এর বেশ ক’বছর পরে অবশ্য আমি ঐ কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়েছিলাম)। আমি প্রায় ১২ বছর আগে এখনকার সরকারী শহীদ মশিয়ূর রহমান কলেজ, ঝিকরগাছা’য় অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেলে তিনি বাড়ি এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

বড়ো মাপের মানুষ; তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তিতে থাকুক।

লেখক : কথাশিল্পী

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/অক্টোবর ২০,২০১৮)