Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » সংবাদ পর্যালোচনা » বিস্তারিত

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নারী কর্মীরা কতটা নিরাপদ?

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ০৫ ২২:৩৫:১৫
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নারী কর্মীরা কতটা নিরাপদ?

হারুন উর রশীদ স্বপন

একটি বেসরকারি টেলিভিশনের চিফ রিপোর্টার নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে৷ প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নারীরা কতটা নিরাপদ?

একুশে টেলিভিশনের চিফ রিপোর্টার এম এম সেকান্দারকে সোমবার রাতে তার বাসা থেকে আটক করে র‌্যাব৷ পরে তাকে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় হস্তান্তর করা হয়৷ মঙ্গলবার তার নারী সহকর্মী তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন৷ সেকান্দারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেয়া হয়েছে৷

ওই নারী অভিযোগ করেন, গত বছর ট্রেইনি রিপোর্টার হিসেবে একুশে টেলিভিশনে যোগ দেয়ার পর থেকেই তাঁকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে যৌন হয়রানি করে আসছিল সেকান্দার৷ তিনি মালিক কর্তৃপক্ষ এবং সিইও'র কাছের লোক হওয়ায় অভিযোগ করতে এতদিন সাহস করেননি৷ এমনকি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অফিসে বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ পরে সেকান্দার নিজের গাড়িতে করে বাসায় নামিয়ে দেয়ার নামে গাড়িতে যৌন হয়রানি করেছেন৷ অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি গত বৃহস্পতিবার ইটিভি কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন৷ বিষয়টি তিনি র‌্যাবকেও জানান৷

তিনি বলেন, ‘‘আমাকে বলা হতো কোথাও কোনো অভিযোগ দিয়ে কাজ হবে না৷ আমি পরিস্থিতিও সেরকম দেখেছি৷ আমি কিছু বলতে গেলে আমাকে অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হতো না৷ আমাকে বসিয়ে রাখা হতো৷ আমি ট্রেইনি রিপোর্টার, আমার পদোন্নতি হবে না বলেও হুমকি দেয়া হয়৷ গত ২৭ জানুয়ারি সর্বশেষ গাড়ির মধ্যে আমাকে যৌন হয়রানি করা হয়৷''

একুশে টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ‘‘আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করার পর আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করে সেকান্দারকে সাসপেন্ড করি৷ আর ওই নারী সাংবাদিককে মামলা করতে বলি৷ কারণ, সে যে অভিযোগ করেছে, সেটা ফৌজদারী অপরাধ৷ তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন৷ তাকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করছি৷ তার নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখছি৷''

আগেই ব্যবস্থা না নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি বৃহস্পতিবার৷ তার আগে ঘটনা আমাদের জানা ছিল না বা কেউ জানায়নি৷ অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি৷''

একুশে টেলিভিশনের প্রাথমিক তদন্তে সেকান্দারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এখনো তদন্ত চলছে৷ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিছু বলা যাবে না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘সেকান্দার গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছে, এসব ঘটনার জন্য সিইও মিস্টার বুলবুল দায়ী৷ আমরা তা সংরক্ষণ করে রেকর্ডে নিয়েছি৷''

বিষয়টি নিয়ে একুশে টেলিভিশনের চিফ রিপোর্টার এম এম সেকান্দারের স্ত্রী'র সঙ্গে কথা বলার জন্য একাধিকবার টেলিফোনে যোগাযোগ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি৷ আর সেকান্দারের ফেসবুক স্টেটাসের ব্যাপারেও তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য জানা যায়নি৷

তবে তার স্ত্রী নিলুফা ইয়াসমীন সোমবার বলেন, ‘ আমার স্বামী নির্দোষ৷ তাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে৷''

তিনি আরো দাবি করেন, ‘‘রাতে র‌্যাব সেকান্দারকে বাসা থেকে নেয়ার সময় আমাদের জানানো হয়, গাড়ি দুর্ঘটনা করে এসেছে সেজন্য তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ পুরো ঘটনাটি সাজানো এবং ষড়যন্ত্র৷ যে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটার কোনো প্রমাণ নেই৷''

সেকান্দারের ফেসবুব স্ট্যাটাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘কিছুদিন আগে সেকান্দারের ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে৷ এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরিও করা ছিল৷ সেই ডায়েরিটির একটি কপিও র‌্যাব নিয়েছে৷''

একুশে টেলিভিশনের সিইও মনজুরুল আহসান বুববুল বলেন, ‘‘সেকান্দারের কিরুদ্ধে মামলা হয়েছে৷ এখন আইনি প্রক্রিয়ায় যা হয়, তাই হবে৷ আর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে আছেন৷ তিনি ফিরলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কী করা যায় সে ব্যাপরে সিদ্ধান্ত হবে৷''

তাঁকে দায়ী করে সেকান্দারের ফেসবুক স্ট্যাটাসের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘আমি নিশ্চিত এবং বিশ্বাস করি, সেকান্দার ফেসবুকে ওই স্ট্যাটাস দেয়নি৷ তার ফেসবুক আইডি হ্যাকড হয়েছিল৷ হ্যাকড হওয়ার পর সে আমার কাছে এসে তা জানিয়েছে৷ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গিয়ে নিজে অভিযোগ করেছে৷ জিডি করেছে৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘আমার ফেসবুক আইডিও হ্যাক করার চেষ্টা হয়েছিল৷ আমি দু'বার গুগল নোটিফিকেশন পেয়েছি৷''

তিনি বলেন, ‘‘যারা আইডি হ্যাক করেছে, তারা কি উদ্দেশ্যে করেছে তারাই ভালো বলতে পারবেন৷''

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ এই প্রথম নয়৷ এর আগে ডিবিসি টেলিভিশনের একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন তাঁরইপরিচিত এক নারী৷ যদিও ঘটনা ওই প্রতিষ্ঠানে নয়৷ এরপর ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের একজন সিনিয়র সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একইভাবে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন তার সাবেক এক নারী সহকর্মী৷ একজন টিভি উপস্থাপকের বিরুদ্ধেও যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে৷ তবে এগুলোর কোনেটারই তদন্ত হয়নি বা তদন্ত শেষ হয়নি৷ ডেইলি স্টারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও তার ফল এখনো জানা যায়নি৷ আর ডিবিসি নিউজের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও এখন সেই কমিটিরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, ‘‘সংবাদ মাধ্যমে কর্মরত নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে৷ নারীরা এখন সংবাদ মাধ্যমে আগের চেয়ে সংখ্যায় বেশি সত্য, কিন্তু এখন আমরা যৌন হয়রানির অনেক অভিযোগও পাচ্ছি৷ কিন্তু অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না নানা কারণে৷ এর মধ্যে চাকরি হারানোর ভয় এবং পদোন্নতির বিষয়টি প্রধান৷ তারপরও নারীরা সাহসী হচ্ছেন৷ কেউ কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করছেন৷''

তিনি সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘আমরা ওইসব সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি৷ তারা তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলেছেন৷ কিন্তু পরে আমরা তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাইনি৷''

বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে৷ তাতে বলা হয়েছে, সরকারি, বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যমে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি করার কথা বলা হয়েছে৷ অভিযোগ নেয়া এবং তা তদন্তের কথা আছে৷ তদন্ত অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা আছে৷ নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, ‘‘বাংলাদেশের কোনো সংবাদ মাধ্যমেই আদালতের নির্দেশ মেনে যৌন নিপীড়নরিরোধী কমিটি নাই৷ আমরা সম্প্রতি সম্পাদকদের চিঠি দিয়ে ওই কমিটি করার অনুরোধ জানিয়েছি৷''

একুশে টেলিভিশনেযৌন নিপীড়ন কোনো কমিটি বা জেন্ডার অ্যাডভাইজার আছে কিনা জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ‘‘না, আমাদের এখানে এ ধরনের কোনো কমিটি নাই৷ আগেও ছিল না৷ তবে এখন আমরা এ ধরনের কমিটি করব৷''

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শাবান মাহমুদ বলেন, ‘‘সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই৷ সংবাদ মাধ্যমগুলো এই নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারে না৷ এ নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের উদ্যোগেই মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত৷ জানতে চাওয়া উচিত কারা যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন করেছে বা করেনি৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘ইদানিং সংবাদ মাধ্যমগুলোতে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে৷ বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশি৷ সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কথিত যৌন হয়রানির ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে৷ এর অবসান হওয়া প্রয়োজন৷ কমিটি থাকলে হয়তো এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না৷''

সূত্র: ডয়চে ভেলে

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ফেব্রুয়ারি ০৫,২০১৯)