Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » কথোপকথন » বিস্তারিত

মার্কিন মুল্লুকেও কনসুলেট অফিস নিয়ে আঞ্চলিকতা 

২০১৯ নভেম্বর ০৫ ০১:৪৪:৪৬

দ্য রিপোর্ট ডেস্ক: সুদূর মার্কিন মুল্লুকেও বাংলাদেশী বাঙালীদের আঞ্চলিকতা মাথা চাড়া উঠেছে। মুলত বাংলাদেশ সরকারের একটি কনসুলেট অফিস স্থাপনকে ঘিরে দেশটির দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের ছয় অঙ্গরাজ্যের মধ্যে চলছে টান টান উত্তেজনা।


দেশের দক্ষিণের শেষ প্রান্তের ফ্লোরিডার মায়ামীতে কন্সুলেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত কোনো ভাবেই মানতে পারছেন না পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্যে জর্জিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা। জর্জিয়ার রাজধানী আটলান্টায় কনসুলেট স্থাপনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন তারা। দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর ও প্রবেশদ্বার আটলান্টা।

দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের মধ্যবর্তী শহর আটলান্টায় কন্সুলেট অফিস স্থাপন করা হলে ভৌগোলিক বিবেচনায় ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, টেনেসি, আলাবামা, নর্থ ক্যারোলিনা ও সাউথ ক্যারোলিনা- এই ছয় রাজ্যের বাংলাদেশিরা সুবিধাজনক দূরত্বের মধ্যে থেকে সেবা পেতে পারে ।

অন্যদিকে ফ্লোরিডার মায়ামীতে কন্সুলেট হলে কেবল সেই রাজ্যের অধিবাসীরাই যে সেবা পাবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। দৃশ্যত বাকী পাঁচ রাজ্যের মানুষের পক্ষে এতো লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে কিংবা বাড়তি পয়সা খরচ করে প্লেনে উড়ে এই প্রতীক্ষিত সেবা নিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হবে।


জর্জিয়ার আটলান্টা যে সত্যি সত্যি একটি যুৎসই শহর কন্সুলেট স্থাপনের ব্যাপারে, তার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে এই শহরে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সোনালী একচেঞ্জ। গত দশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শাখাগুলির চাইতে আটলান্টা শাখা সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আয় করে যাচ্ছে আর গত তিন বছর ধরে। এ রেমিটেন্সের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও অবস্থানের দিক থেকে সুবিধাজনক দূরত্বের মধ্যে হওয়ায় ছয়টি রাজ্যের প্রবাসী বাংলাদেশি স্বচ্ছন্দে তাদের সেবা গ্রহণ করছেন এই সোনালী একচেঞ্জের শাখার মাধ্যমে। এখানে বলা প্রয়োজন, সোনালী একচেঞ্জ স্থাপনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার যথাযথ জরিপের মাধ্যমেই কিন্ত ইতোপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শাখা খুলেছিল, যা ছিল নিঃসন্দেহে সঠিক সিদ্ধান্তের ফসল।
সরকারের যদি ফ্লোরিডা ও জর্জিয়া দুই রাজ্যেই কন্সুলেট স্থাপনের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেক্ষেত্রে সেটি হবে আনন্দের কথা, এতে আমাদের কোনই সমস্যা নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি একটি শহরেই এই কন্সুলেট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনাতে আটলান্টাতেই এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জোরালো এবং যুক্তিসঙ্গত দাবি রাখে।

আবার আরও একটি উদাহরণ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ দূতাবাসের কথাই ধরা যাক না কেন ! এক্ষেত্রেও পুরো যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বাংলাদেশি অধ্যুষিত শহরে এই ভ্রাম্যমাণ সেবা কার্যক্রম চলে, সেসবের মধ্যেও আটলান্টার ভ্রাম্যমাণ দূতাবাসের সেবা দেওয়ার হার সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকছে অধিকাংশ সময়ই। অথচ স্থায়ী কন্সুলেট স্থাপনের ব্যাপারে হঠাৎ করে জর্জিয়া রাজ্যের নামটি বাদ পড়ে কেনই বা দক্ষিণ-পুর্বের সর্বশেষ প্রান্তের ফ্লোরিডায় ছিটকে পড়লো, এটা অনুধাবন করাই এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ওই অঞ্চলের নামীদামী স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের লবিং বা তদবিরের কারণেই এই সিদ্ধান্তটি প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছেন। অথচ অধিক মানুষের সেবা দেওয়ার স্থানকে উপেক্ষা করে অপেক্ষাকৃত কম মানুষের সেবা দিতে সরকারী অর্থ ব্যয় আদৌ কতটা ন্যায়সঙ্গত সেটি ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করেননি কেউ।

গত ২ নভেম্বর, শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছে আটলান্টার বিভিন্ন সংগঠকদের অংশগ্রহণে অভাবনীয় একটি সভা। এখানে সবার আলোচনায় ঘুরে ফিরে একটি দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠেছে, আর সেটি এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী কনস্যুলেট অফিস স্থাপন। জর্জিয়া বাংলাদেশ সমিতির আয়োজনে সভাপতি মোস্তফা কামাল মাহমুদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এ এই রাসেলের পরিচালনায় ওইদিন সংগঠকদের মধ্যে মোহাম্মদ জামান ঝন্টু, মশিউর রহমান চৌধুরী, এম মওলা দিলু, ডিউক খান, মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন, নাহিদুল খান সাহেল, আরেফীন বাবুল, রুমী কবির, মামুন শরীফ, নজরুল ইসলাম, আহমাদুর রহমান পারভেজ, আরিফ আহমেদ, এম ডি নাসের, মিনহাজুল ইসলাম বাদল, আসীম সাহা, রশিদ মালিক, ওয়াসি উদ্দিন, ইউসুফ আলী পিন্টু, দেবযানী সাহা, সজল খান, রায়হান রাহী, সাদমান সুমন, মাহবুব আলম সাগর, অভিষেক শ্যাম, বাবু সহ অনেকে। তাদের বক্তব্যে একটি দাবি বার বার উঠে এসেছে।

তারা স্মরণ করেছেন ২০১৪ কি ২০১৫ সালের দিকে আটলান্টায় ভ্রমনে আসা ওয়াশিংটন ডিসির মিনিস্টার (কন্সুলার)-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা শামসুল হকের কথা। সে সময় তিনি বলেছেলেন কাজের ফাঁকে বলছিলেন যে, ভৌগোলিক বিবেচনায় জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা হচ্ছে বেস্ট প্লেস, যেখান থেকে ফ্লোরিডাসহ আশপাশের অন্যান্য পাঁচ কি ছয়টি রাজ্যের প্রবাসীরা খুব সহজেই সেবা নিতে পারবে।

বক্তারা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, আজকের দিনে যেখানে কেবল জর্জিয়া রাজ্যেই প্রায় চল্লিশ হাজার বাংলাদেশি বাস করেন, যা ফ্লোরিডা রাজ্যের বাংলাদেশিদের তুলনায় প্রায় দিগুনেরও বেশি, সেই অঞ্চলে কন্সুলেট না হয়ে হতে যাচ্ছে দেশের শেষ প্রান্তে। যার সাথে এতগুলো রাজ্যের প্রবাসীদের স্বচ্ছন্দে সেবা নেওয়ার কোন সুযোগই থাকবে না।

তারা আরো বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় সোনালী একচেঞ্জ হয়েছে সেখনাকার ভৌগলিক ও জনসংখ্যার বিবেচনায়। ঠিক একইভাবে শিকাগোতে এমনকি নিউ ইয়র্কেও এবং এই সবকটি অঞ্চলেই কনস্যুলেট অফিসও বসেছে ঠিক ঠিক সংগত কারণেই। একই নিয়মে জর্জিয়াতেও সোনালী একচেঞ্জ স্থাপিত হলো, কিন্তু কনসুলেটের প্রশ্নে সেটা চলে গেল দেশের শেষ প্রান্তের মায়ামীতে !

ফ্লোরিডায় কন্সুলেট স্থাপনের খবরটি এক বছর আগের পুরনো।
ভ্রাম্যমান দূতাবাসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও প্রথম সেক্রেটারি আশফাকুল নুমান আগেই জানিয়েছিলেন, “নীতিগতভাবে ফ্লোরিডার মায়ামীতে কনসুলেট অফিস স্থাপনের সিদ্ধান্তটি সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত হয়ে আছে। কাজেই পাশের রাজ্যে আরেকটি অফিস স্থাপনের কোন চিন্তা-ভাবনাই এই মুহূর্তে সরকারের নেই”।

তাই জর্জিয়া রাজ্যসহ আশপাশের অঙ্গরাজ্যের প্রবাসীরা এই বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করেই সরব হয়ে ওঠেছেন। ফলে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন, ইমেইল, ফেস বুক, টেক্সটিং বা সভা সমাবেশে এই নিয়ে উচ্চবাচ্চ্য শুরু হয়েছে। এছাড়া যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন পত্র লিখে গণ স্বাক্ষর সংগ্রহও শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। মোট কথা, যৌক্তিক অধিকার আদায়ে সর্বস্তরের সচেতন বিবেকগুলো নাড়া দিচ্ছে এখন।

গত কয়েকদিনে এই প্রসঙ্গটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বলতে গেলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রথম দাবি জানিয়ে পোস্টিং দেন এখানকার চিকিৎসক ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুহাম্মদ আলী মানিক। এরপর এগিয়ে আসেন মাহবুব ভূঁইয়া, গিয়াস উদ্দিন ভূঁইয়া, মানচিত্র নিউজ ও শনিবারের চিঠি নামের দুইটি অনলাইন মিডিয়া।

এবিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানানো হয় ওই বৈঠক থেকে। । ভৌগোলিক বিবেচনা থেকে অধিক বাংলাদেশির সেবা দিতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর আটলান্টাই কন্সুলেট স্থাপনের যথাযথ শহর বলে তাদের বিশ্বাস ।

সেটি সম্ভব না হলে ফ্লোরিডার পাশাপাশি জর্জিয়ার আটলান্টাতেও উল্লেখিত পর্যালোচনার আলোকে আরও একটি কন্সুলেট ২ নভেম্বরের আলোচকরা।